জয় এসেছে, সতর্কবার্তাও স্পষ্ট: ইংল্যান্ডের আগে আর্জেন্টিনার চার জায়গায় কাজ জরুরি
সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয় এসেছে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিটও নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু স্কোরবোর্ডে ৩-১ ব্যবধান দেখলেও ম্যাচটি মোটেই একপেশে ছিল না।
প্রথমে এগিয়ে যাওয়া, পরে সমতা হজম করা এবং দশজনের প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে অতিরিক্ত সময়ের শেষ ভাগ পর্যন্ত অপেক্ষা—ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নামার আগে লিয়োনেল স্কালোনির হাতে বেশ কিছু কাজ রয়েছে।
আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডও কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে হারিয়েছে। ফলে দুই দলই শারীরিক ধকল নিয়ে সেমিফাইনালে নামবে। তবে সুইজারল্যান্ড ম্যাচে আর্জেন্টিনার যে দুর্বলতাগুলি সামনে এসেছে, সেগুলি দ্রুত সামলাতে না পারলে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়াই কঠিন হতে পারে।
এক নজরে
- নকআউট পর্বের তিন ম্যাচেই গোল হজম করেছে আর্জেন্টিনা
- চাপ বাড়লে মাঝমাঠ ও রক্ষণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে
- দশজনের সুইজারল্যান্ডের রক্ষণ ভাঙতেও দীর্ঘ সময় লেগেছে
- টানা কঠিন ম্যাচের পর খেলোয়াড়দের পুনরুদ্ধার বড় বিষয়
সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে কী ঘটেছিল?
দশম মিনিটে লিয়োনেল মেসির কর্নার থেকে হেডে গোল করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। প্রথমার্ধে এগিয়ে থাকলেও বিরতির পর সুইজারল্যান্ড আক্রমণের চাপ বাড়ায়। এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে কয়েকবার কঠিন বল সামলাতে হয়।
৬৭ মিনিটে রিকার্ডো রদ্রিগেজের সঙ্গে বল আদান-প্রদানের পর দান এনদোয়ে সমতা ফেরান। পাঁচ মিনিট পরে ব্রিল এমবোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। ভিডিয়ো সহকারী প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুল খেলোয়াড়কে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত সংশোধনের পর এমবোলোর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দশজন হয়ে যাওয়ার পর সুইজারল্যান্ড রক্ষণ আরও গুটিয়ে নেয়। আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ করলেও জয়সূচক গোল আসে ১১২ মিনিটে। দূরপাল্লার শটে দলকে এগিয়ে দেন হুলিয়ান আলভারেস। পরে লাউতারো মার্তিনেস তৃতীয় গোলটি করেন।
প্রথম উদ্বেগ: রক্ষণে চাপ পড়লেই তৈরি হচ্ছে ফাঁক
নকআউট পর্বে এখনও পর্যন্ত তিন ম্যাচ খেলে প্রতিটিতেই গোল হজম করেছে আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ জয়, মিশরের বিরুদ্ধে ৩-২ ব্যবধানে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন এবং সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩-১ জয়—তিন ম্যাচে মোট পাঁচ গোল ঢুকেছে আর্জেন্টিনার জালে।
কেপ ভার্দে দু’বার পিছিয়ে পড়েও সমতা ফিরিয়েছিল। মিশর ম্যাচে শেষ ১১ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। সুইজারল্যান্ডও দ্বিতীয়ার্ধে দ্রুত বল বাড়িয়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে সমস্যায় ফেলেছে।
এই ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে, বল হারানোর পরে রক্ষণে ফেরার গতি এবং দুই প্রান্তের জায়গা বন্ধ করার ক্ষেত্রে উন্নতি দরকার। ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ সেই সুযোগ পেলে আরও বড় বিপদ তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় উদ্বেগ: মাঝমাঠ ও রক্ষণের মধ্যে দূরত্ব
কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচের পর মেসি নিজেই জানিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনা ঠিকমতো চাপ তৈরি করতে পারেনি এবং দলের বিভিন্ন সারির মধ্যে দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল। সেই কারণে বল ফিরে পেতে খেলোয়াড়দের বেশি দৌড়াতে হয়েছে।
সুইজারল্যান্ড ম্যাচেও দ্বিতীয়ার্ধের একটি সময়ে একই সমস্যা দেখা যায়। মাঝমাঠের প্রথম প্রতিরোধ ভেঙে যাওয়ার পর সুইস খেলোয়াড়েরা সরাসরি আর্জেন্টিনার রক্ষণের সামনে পৌঁছে যাচ্ছিলেন।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ হবে। নরওয়ের বিরুদ্ধে জুড বেলিংহ্যাম দু’টি গোল করেছেন। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে পেনাল্টি এলাকায় ঢোকার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। ফলে রদ্রিগো দে পল, এনজো ফের্নান্দেস এবং ম্যাক অ্যালিস্টারদের রক্ষণের সঙ্গে যোগাযোগ আরও নিবিড় রাখতে হবে।
তৃতীয় উদ্বেগ: ঘন রক্ষণ ভাঙতে দীর্ঘ সময়
৭২ মিনিটে সুইজারল্যান্ড দশজন হয়ে গেলেও আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলটি আসে ১১২ মিনিটে। অর্থাৎ একজন বেশি নিয়ে খেলেও প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে প্রায় ৪০ মিনিট সময় লেগেছে।
সুইজারল্যান্ড নিজেদের পেনাল্টি এলাকার কাছে খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়িয়ে মেসি ও আলভারেসের জন্য জায়গা কমিয়ে দিয়েছিল। আর্জেন্টিনা বলের দখল রাখলেও অনেক আক্রমণ একই পথে এগিয়েছে। দুই প্রান্ত থেকে দ্রুত বল বাড়ানো এবং দূরপাল্লার শটের চেষ্টা আরও আগে করা যেত।
শেষ পর্যন্ত আলভারেসের দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটেই বাধা ভাঙে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডও প্রয়োজনে নিচে নেমে জায়গা বন্ধ করতে পারে। তাই শুধু মেসির সৃষ্টিশীল মুহূর্তের অপেক্ষা না করে আক্রমণে একাধিক পথ খোলা রাখতে হবে।
চতুর্থ উদ্বেগ: টানা দীর্ঘ ম্যাচের শারীরিক ধকল
আর্জেন্টিনার তিনটি নকআউট ম্যাচের মধ্যে দু’টি অতিরিক্ত সময়ে গিয়েছে। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের পর মিশরের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রবল চাপ নিতে হয়েছে। সুইজারল্যান্ড ম্যাচেও খেলতে হয়েছে অতিরিক্ত সময়।
মেসির বয়স ৩৯ বছর। দলের আক্রমণে তাঁর প্রভাব এখনও সবচেয়ে বেশি। তবে প্রতিটি আক্রমণে তাঁকেই বল তৈরি ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দিলে সেমিফাইনালের শেষ দিকে ক্লান্তির প্রভাব পড়তে পারে।
স্কালোনির তাই বদলি খেলোয়াড় ব্যবহারের সময় এবং মাঝমাঠের ভারসাম্য নিয়ে ভাবতে হবে। আলভারেস, লাউতারো, থিয়াগো আলমাদা ও অন্যদের দায়িত্ব বাড়লে মেসির উপর চাপ কমবে।
অবশ্য ইংল্যান্ডও নরওয়ের বিরুদ্ধে ১২০ মিনিট খেলেছে। তাই শারীরিক ক্লান্তির সমস্যা শুধু আর্জেন্টিনার নয়। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেলও স্বীকার করেছেন, তাঁর দল কোয়ার্টার ফাইনালে প্রত্যাশামতো খেলতে পারেনি এবং একাধিক ভুল করেছিল।
উদ্বেগের পাশাপাশি রয়েছে বড় শক্তিও
দুর্বলতা সামনে এলেও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হল কঠিন পরিস্থিতি থেকে ম্যাচ বের করে আনার ক্ষমতা। কেপ ভার্দে, মিশর এবং সুইজারল্যান্ড—তিনটি ম্যাচেই চাপের মুখে ভেঙে না পড়ে শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছে তারা।
এমিলিয়ানো মার্তিনেস গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলকে বাঁচিয়েছেন। ম্যাক অ্যালিস্টার, আলভারেস এবং লাউতারোর গোলও দেখিয়েছে, মেসির বাইরে থেকেও সিদ্ধান্তমূলক অবদান আসছে।
সেমিফাইনালের আগে স্কালোনির প্রধান কাজ হবে মাঝমাঠ ও রক্ষণের দূরত্ব কমানো, বল হারানোর পর দ্রুত অবস্থানে ফেরা এবং আক্রমণের ধরনে বৈচিত্র্য আনা। সেগুলি করতে পারলে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়েই নামতে পারবে।
আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল আটলান্টায় ১৫ জুলাই স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় শুরু হবে। ভারতীয় সময় ম্যাচটি শুরু হবে ১৬ জুলাই রাত ১২টা ৩০ মিনিটে।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার ম্যাচ প্রতিবেদন এবং বিশ্বকাপের প্রকাশিত সূচি।
