হরমুজে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা চালাবে ওমান ও ইরান
মাস্কাট: হরমুজে নৌচলাচল নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখার পথ খুঁজতে কারিগরি এবং রাজনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওমান ও ইরান। মাস্কাটে দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন মেনে নৌচলাচলের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই পরবর্তী আলোচনা হবে।
এই সিদ্ধান্ত কোনও চূড়ান্ত নৌচলাচল চুক্তি নয়। বরং কোন পথে জাহাজ চলবে, কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং উপকূলবর্তী দুই দেশের অধিকার কীভাবে রক্ষা পাবে—এসব নিয়ে আরও আলোচনার পথ খোলা রাখা হয়েছে। এর আগে ওমান ও ইরান যৌথ কর্মগোষ্ঠীর মাধ্যমে হরমুজে নৌচলাচলের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক পরিষেবা এবং সম্ভাব্য খরচ নিয়ে আলোচনা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
মাস্কাটের বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা?
ওমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রভাবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তার বাস্তব ও আইনি দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই দেশ এমন একটি ব্যবস্থা খুঁজতে চাইছে, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক নৌচলাচল ব্যাহত না হয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ওমানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেছেন। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনায় চলমান সমঝোতার আওতায় উপযুক্ত নিরাপত্তা পদ্ধতি খোঁজার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে এখনও কোনও নির্দিষ্ট পথ, নতুন নিয়ম বা সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। ফলে হরমুজের নৌচলাচল নিয়ে সব মতপার্থক্য মিটে গিয়েছে—এমন বলা যাবে না।
আগের সমঝোতার সঙ্গে নতুন সিদ্ধান্তের সম্পর্ক
২৩ জুন ওমান ও ইরানের যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীকে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। দুই দেশ জানিয়েছিল, তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ কর্মগোষ্ঠী আলোচনা চালাবে। প্রয়োজনে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য উপকূলবর্তী দেশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গেও পরামর্শ করা হবে।
ওমান ও ইরান উভয়েই হরমুজের উপকূলবর্তী দেশ। তাই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতার পাশাপাশি নিজেদের আঞ্চলিক জলসীমা ও সার্বভৌম অধিকারের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজাই আলোচনার প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এখনও কোন বিষয়গুলিতে সমঝোতা হয়নি?
এখনও অন্তত চারটি বিষয় পুরোপুরি পরিষ্কার নয়—
- বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য কোন নৌপথ ব্যবহার করা হবে
- জাহাজের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে
- কোনও সামুদ্রিক পরিষেবা বা খরচ আরোপ করা হবে কি না
- ওমান, ইরান এবং অন্য উপকূলবর্তী দেশগুলির ভূমিকা কী হবে
আগের যৌথ বিবৃতিতে নৌচলাচলের ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক পরিষেবা এবং তার সম্ভাব্য খরচ নিয়ে আলোচনা চালানোর কথা ছিল। তবে কোনও ফি বা নতুন বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
সুতরাং এখনই জাহাজ চলাচলে নতুন কর, অনুমতিপত্র বা স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ চালু হয়েছে—এমন দাবি বিভ্রান্তিকর হবে।
কেন ওমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালীর এক পাশে ইরান এবং অন্য পাশে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রণালীর নৌপথ নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে দুই দেশের সমন্বয় প্রয়োজন।
ওমান দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও পশ্চিমি দেশগুলির মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেও মাস্কাট আলোচনা চালু রাখার চেষ্টা করেছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওমান সফরের মূল বিষয়গুলির একটি ছিল জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হরমুজে সংঘর্ষ এড়ানো ও জাহাজ চলাচল নিরাপদ করার জন্য যে পৃথক নৌপথ ব্যবস্থা রয়েছে, সেটিও ওমান ও ইরানের প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালী এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালী। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার ও ইরানের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রফতানি এই জলপথের উপর নির্ভরশীল।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে, ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই পথ দিয়ে গেছে। এটি বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। একই বছরে বিশ্বের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশও হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছিল।
তাই এই প্রণালীতে হামলা, দীর্ঘ বিলম্ব বা জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না।
ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারত তার প্রয়োজনের বড় অংশের অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস আমদানি করে। হরমুজে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক তেলের দাম, জাহাজের ভাড়া এবং বীমার খরচ বাড়তে পারে। এর প্রভাব দেশে জ্বালানি আমদানির ব্যয়, পরিবহণ এবং শিল্পের উৎপাদন খরচে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে ওমান ও ইরানের আলোচনা শুরু হওয়া মানেই তেলের দাম সঙ্গে সঙ্গে কমবে—এমন নয়। বাজারের প্রতিক্রিয়া নির্ভর করবে বাস্তবে জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হয়, নতুন হামলা বন্ধ থাকে কি না এবং বৃহত্তর কূটনৈতিক আলোচনা কতটা এগোয় তার উপর।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান প্রকাশ্যে জানাক যে হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না এবং জাহাজের উপর হামলা বন্ধ থাকবে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর ওয়াশিংটন নিরাপদ ও অবাধ চলাচলের স্পষ্ট নিশ্চয়তা চেয়েছে।
ইরান অবশ্য নৌচলাচলের নিরাপত্তার পাশাপাশি উপকূলবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে নিজের সার্বভৌম অধিকারের বিষয়টিও সামনে রাখছে। এই জায়গাতেই রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্ব বেশি।
এখন নজর কোথায়?
পরবর্তী বৈঠকে কারিগরি পর্যায়ের প্রস্তাবগুলি কতটা নির্দিষ্ট হয়, সেটাই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দ্বিতীয়ত, অন্য উপকূলবর্তী দেশ এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাকে আলোচনায় কতটা যুক্ত করা হয়, তা নজরে থাকবে।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাস্তব পরিস্থিতিতে। জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে কি না, বীমা ও পরিবহণ ব্যয় কমে কি না এবং নতুন কোনও সামরিক সংঘর্ষ এড়ানো যায় কি না—এসবের উপর আলোচনার সাফল্য নির্ভর করবে।
ওমান ও ইরানের সিদ্ধান্ত আপাতত কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত। তবে নিরাপদ নৌচলাচলের স্থায়ী কাঠামো তৈরি করতে হলে রাজনৈতিক ঘোষণা থেকে এগিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম, দায়িত্ব এবং নজরদারির ব্যবস্থা চূড়ান্ত করতে হবে।
তথ্যসূত্র: ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা, ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের যৌথ বিবৃতি, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা এবং জ্বালানি-বাণিজ্য সংক্রান্ত সরকারি পরিসংখ্যান।
