রাজ্য

‘সব প্রমাণ আমার কাছে’, ২০২৬-এর পরাজয় নিয়ে বিস্ফোরক মমতা

কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয় এবং দলের ভিতরে ধারাবাহিক ভাঙনের মধ্যে কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে ভিডিও বার্তা দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, বিজেপি তাঁকে নীরব করার পাশাপাশি তৃণমূলের প্রথম সারির নেতাদেরও রাজনৈতিকভাবে নিশানা করছে।

ভিডিও বার্তায় মমতা বলেন, তাঁকে থামাতে হলে হত্যা করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তৃণমূলকে দুর্বল করতে ভয় দেখানো, মামলা এবং হামলার পথ নেওয়া হচ্ছে। তবে তাঁর তোলা অভিযোগগুলির সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, বিজেপি তাঁকে রাজনৈতিকভাবে চুপ করানোর চেষ্টা করছে। তাঁর কথায়, “আমাকে নীরব করতে হলে হত্যা করতে হবে।”

তাঁর দাবি, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। অনেককে ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। দল না ছাড়া নেতা-কর্মীদের পাশে থাকার বার্তাও দেন তৃণমূল নেত্রী।

দলত্যাগীদের উদ্দেশে সরাসরি আক্রমণ না করলেও তাঁর বক্তব্যে ক্ষোভ স্পষ্ট ছিল। যাঁরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দলের সঙ্গে রয়েছেন, তাঁদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

মহুয়া, অভিষেক ও কল্যাণের নাম উল্লেখ

ভিডিও বার্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংসদ মহুয়া মৈত্র, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি ওই নেতাদের নানাভাবে হেনস্থা করেছে।

নিজের বাড়িকেও নিশানা করা হয়েছে বলে দাবি করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি এই বক্তব্য রেখেছেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ভিডিওতে দেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির সামনে বড় পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, তাঁদের বাড়ি থেকে বেরোতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সেই অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য সামনে আসেনি।

ভোট লুটের অভিযোগ, প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে নয়

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, ভোট লুট এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে।

গণনাকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। মমতা জানান, তাঁদের কাছে এই সংক্রান্ত প্রমাণ রয়েছে। তবে ভিডিও বার্তায় সেই প্রমাণের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি ২০৭টি আসন পেয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে ৮০টি আসনে। কংগ্রেস ও অন্য কয়েকটি দল বাকি আসনগুলি পেয়েছে।

ফলে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী।

নির্বাচনী পরাজয়ের পর তৃণমূলে বড় ভাঙন

বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূলের সাংগঠনিক সংকট প্রকাশ্যে আসে। দলের একাংশ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হয়। বিধানসভার বেশ কয়েকজন সদস্য ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরের পাশে দাঁড়ান।

লোকসভাতেও দলের বড় অংশ পৃথক অবস্থান নিয়েছে। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী দাবি করেছে, তৃণমূলের ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জন তাদের সঙ্গে রয়েছেন।

ওই সাংসদেরা লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার কাছে পৃথক আসনের আবেদন করেন। পরে তাঁরা ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এনডিএকে সমর্থনের সিদ্ধান্তের কথা জানান। তবে এই প্রক্রিয়ার আইনগত ও সংসদীয় স্বীকৃতি নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্ন ছিল।

তিন প্রাক্তন সাংসদের বিজেপিতে যোগ

তৃণমূলের সংকটের মধ্যেই সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইক বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনজনই তৃণমূলের প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ।

বৃহস্পতিবার কলকাতায় বিজেপির রাজ্য দফতরে তাঁদের হাতে দলীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনজনকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভা উপনির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করে বিজেপি।

আগামী ২৪ জুলাই রাজ্যের তিনটি রাজ্যসভা আসনে উপনির্বাচন হওয়ার কথা। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তিনটি আসনেই বিজেপি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ মমতার এই বার্তা

মমতার ভিডিও বার্তা শুধু বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ নয়। দলের বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি তৃণমূলের অনুগত নেতা-কর্মীদের ধরে রাখার চেষ্টাও।

বিধানসভা এবং সংসদ—দুই জায়গাতেই দলের ভিতরের বিভাজন প্রকাশ্যে এসেছে। এই অবস্থায় নিজের রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন মমতা।

একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে দলীয় কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তবে ভোটে কারচুপি বা গণনাকেন্দ্র দখলের মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।

মমতার অভিযোগ নিয়ে বিজেপির বিস্তারিত পাল্টা বক্তব্য সামনে এলে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়তে পারে। আপাতত তৃণমূলের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ এবং বিদ্রোহী শিবিরের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।