আন্তর্জাতিক

‘ওরা হয়তো মেরে ফেলবে’! ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা

নয়াদিল্লি/ঢাকা: প্রায় দুই বছর ভারতে থাকার পর বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানালেন সে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তব্য, ডিসেম্বর ২০২৬-এর আশপাশে আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রবীণ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরতে চান তিনি। এরপর আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে শেখ হাসিনা ফেরার কোনও নির্দিষ্ট তারিখ জানাননি। কোন আদালতে তিনি হাজির হবেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত বলেননি। বাংলাদেশ বা ভারত সরকারের সঙ্গে এই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়নি বলেও দাবি করেছেন তিনি।

ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় দেওয়া দীর্ঘ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে। এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেননি তিনি।

তার পরেও দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে তিনি অনড় বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, মৃত্যু এলেও তিনি নিজের দেশের মাটিতেই তা মোকাবিলা করতে চান।

শেখ হাসিনার দাবি, আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। সেই কারণেই তিনি নির্বাসিত নেতাদের একসঙ্গে দেশে ফিরে আদালতের সামনে হাজির হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তাঁর সঙ্গে ঠিক কোন কোন নেতা ফিরবেন, তা স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যও এখনও পাওয়া যায়নি।

মৃত্যুদণ্ডের রায় কেন

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিরোধিতা থেকে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন পরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পরিণত হয়।

আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে চলে আসেন শেখ হাসিনা। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে।

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আদালত তাঁকে উসকানি, হত্যার নির্দেশ এবং নৃশংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে।

শেখ হাসিনা শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, বিচারপ্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট। তবে এটি তাঁর বক্তব্য; আদালত রায়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।

প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও একই মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য সফরসঙ্গীদের মধ্যে তাঁর নাম থাকতে পারে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়।

আন্দোলনে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল

জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। নিহতদের মধ্যে শতাধিক শিশু ছিল বলেও জাতিসংঘ জানিয়েছিল।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধেও হিংসায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে প্রতিটি মৃত্যুর জন্য ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ আদালতের বিষয়। জাতিসংঘের অনুসন্ধান এবং বাংলাদেশের আদালতের বিচারপ্রক্রিয়াকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা

২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের সমস্ত রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন। পরে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।

এর ফলে ২০২৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া না হলে দলটির স্বাভাবিক নির্বাচনী কার্যক্রমে ফেরার সুযোগও সীমিত থাকবে।

শেখ হাসিনা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে না রেখে জনগণকেই দলের কাজের বিচার করতে দেওয়া উচিত।

তিনি আরও দাবি করেছেন, দলের সংগঠন পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি এলাকা নিয়ে অনলাইনে বৈঠক করেছেন। এই দাবির স্বাধীন যাচাই এখনও সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশে এখন কার সরকার

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠিত হয়েছিল। তবে সেই প্রশাসনের মেয়াদ শেষ হয়েছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বড় জয় পায়। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বলে উল্লেখ করা ঠিক হবে না।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার নতুন বক্তব্য নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন কীভাবে সামলানো হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কী প্রভাব পড়তে পারে

বাংলাদেশ একাধিকবার ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারত তাঁকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।

ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ২০২৬ সালের এপ্রিলে জানিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।

শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরলে প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের ওপর থাকা চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে তাঁর মৃত্যুদণ্ড, আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন নতুন কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘোষণা

দেশে ফেরার সময়সীমা দেওয়ার ঘটনা এই প্রথম বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। এর আগে তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বললেও আত্মসমর্পণের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।

তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে আদালতের রায় কার্যকর করার প্রশ্ন থাকবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক ও আইনি ভবিষ্যৎ নিয়েও বিতর্ক বাড়তে পারে।

তবে ডিসেম্বর এখনও কয়েক মাস দূরে। শেখ হাসিনা নির্দিষ্ট তারিখ জানাননি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারগুলিও তাঁর পরিকল্পনা নিশ্চিত করেনি। তাই আপাতত এটিকে তাঁর ঘোষিত পরিকল্পনা হিসেবেই দেখা উচিত, চূড়ান্ত সফরসূচি হিসেবে নয়।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।